দ্রুত হাই প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ঘরোয়া উপায়

High Blood Pressure Tips

হাই ব্লাড প্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপার টেনশনকে বলা হয় “নীরব ঘাতক” কারণ এটা প্রতিনিয়ত আপনার ক্ষতি করে যাবে কোন দৃশ্যমান শারীরিক লক্ষন ছাড়াই । যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তারা হার্ট এটাক ও স্ট্রোকের সর্বোচ্চ ঝুকিতা থাকেন এবং এই দুইটি সমস্যায় পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

আপনার রক্তচাপ নির্ভর করে আপনার হৃদয় কতটুকু রক্ত ​​পাম্প করছে এবং কত জোরে আপনার রক্ত আপনার রক্তনালিতে চলাচল করতে পারে তার উপর। রক্তনালী যত চিকন হবে রক্তচাপ তত বেশি হবে।

রক্ত চাপ ১২০/৮০ বা তার কাছাকাছি থাকলে একে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নেয়া হয়, যদি রক্ত চাপ ১২০/৮০ এর বেশি হয় তখন এই অবস্থাকে উচ্চ রক্ত চাপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদি আপনার রক্ত চাপ স্বাভাবিক অবস্থার থেকে বেড়ে যায় এবং তা ১৩০/৮০ এর মধ্যে থাকে তবে ধরে নেয়া হয় যে আপনি উচ্চ রক্ত চাপের ঝুকিতে আছেন।

তবে আশার কথা হচ্ছে এই যে – কোন ধরনের ঔষধ সেবন ছাড়াইই আপনার নিয়মিত জীবনযাপনের ধরনে কিছু কিছু অভ্যাস পরিবর্তন ও সংযোজনের মাধ্যমে খুব সহজেই আপনি আপনার এই ঝুকিকে পুরোপুরি কমিয়ে আনতে পারেন।

হাই ব্লাড প্রেশার বা উচ্চ রক্তচাপ কমানোর ঘরোয়া উপায়

খুব সহজে উচ্চ রক্ত চাপ কমানোর ঘরোয়া ও গুরত্বপূর্ন উপায় সমূহ নিচে দেয়া হলো-

০১. এক্টিভ হোন এবং প্রতিনিয়ত শরীর চর্চার অভ্যাস গড়ে তুলুন

নিজের ও গৃহস্থলীর ছোট ছোট কাজগুলো নিজে নিজে করার চেষ্টা করুন সাথে এরোবিক এক্সারসাইজ করুন। যদি আপনি নিয়মিত এক্সারসাইজ করেন তবে আস্তে আস্তে আপনার হার্ট শক্তিশালী হবে এবং খুব কম চাপেই আপনার হার্ট আপনার রক্তনালীতে রক্ত সঞ্চালন করতে পারবে। এতেকরে আপনার রক্তনালীতে চাপ কম পরবে এবং আপনার উচ্চ রক্তচাপ কমাবে।

এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে আমি ঠিক কতিটুকু বা কত সময় ধরে এক্সারসাইজ করবো। ২০১৩ সালে আমেরিকান হার্ট এ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে – সপ্তাহে ৩/৪ দিন ৪০ মিনিট মডারেট এক্সারসাইজ যেমন দ্রূত হাটা বা জগিং করা অনেকাংশেই আপনার উচ্চ রক্ত চাপের ঝুকি কমিয়ে দিবে। যদি একটানা ৪০ মিনিট এক্সারসাইজ করা সম্ভব না হয়ে তবে ১০-১৫ মিনিট করে ভেঙ্গে ভেঙ্গে ও এক্সসারসাইজ করা যাবে।

এক্সারসাইজ মানেই যে জোরে হাটতে হবে বা দৌড়াতে হবে বিষটি এমন না- আপনার একটিভিটি লেভেল বাড়ানোর জন্য এক্সারসাইজের বিকল্প হিসেবে আপনি এই কাজগুলো নিয়মত করতে পারেন-

  • লিফট ব্যবহার না করে সিড়ি বেয়ে উঠা-নামা করা
  • অল্প দূরত্বের জায়গা গাড়ি বা যানবাহন ব্যবহার না করে হেটে যাওয়া
  • ঘরের কাজকর্ম নিজেই করা
  • বাগান করা
  • সাইকেলে করে কোথাও ঘুরে আসা
  • মাঠে খেলাধুলা করা

০২. অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলা

যদি আপনার ওজন স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশি হয় তবে এটা আপনার উচ্চ রক্ত চাপের ঝুকিকে বাড়িয়ে দেয়, শুধু মাত্র ৪-৫ কেজি ওজন কমানোর মাধ্যমেই আপনি উচ্চ রক্তচাপের ঝুকি অনেকাংশেই কমিয়ে ফেলতে পারেন। এছাড়া শরীরের সঠিক ওজন বজায় রাখার মধ্যমে আপনি অন্যান্য রোগের ঝুকি থেকেও নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হবেন।

বোনাস টিপস (Bonus Tips)

অতিরিক্ত ওজন কমানোর সাথে সাথে আপনার সঠিক (BMI) জানতে বাসায় ভাল মানের ওজন মাপার মেশিন রাখতে পারেন, এতে আপনি নিয়মিত আপনার ওজন মেপে দেখতে পারবেন যে উচ্চতা অনুযায়ী আপনার ওজন কত।

Tanita Digital Weighing Machine
Digital Weighing Machine with BMI Calculation for home use

সেরা ৫ টি ওজন মাপার মেশিনের নাম ও দাম জানতে এখানে ক্লিক করুন।

০৩. চিনি ও কার্বোহাইড্রেটস খাবার কমিয়ে দেয়া

গবেষণায় দেখা গেছে যে মিষ্টি জাতীয় খাবার ও বেশি বেশি ভাত খাওয়া কমালে এটি আপনার ওজন কমাতে সাহাযা করবে যা আপনার রক্তচাপ কমানোর ব্যপারে সহায়ক হবে। আপনার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, গোটা শস্য, কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার, চামড়াবিহীন মুরগির মাংস, মসুর ডালের ইত্যাদি খাবার রাখুন যা আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি রক্তচাপ কমানোর ব্যপারে সহায়ক হবে।

০৪. পক্রিয়াজাত করা খাবার পরিহার করা

পক্রিয়াজাত করা খাবার যেমন চিপস, পিটজা, সফট ড্রিঙ্কস ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। এছাড়া রেস্টুরেন্ট বা ফাস্টফুড জাতীয় বেশিরভাগ খাবারেই স্বাদ বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত মশলা, লবন ও চিনির ব্যবহার করা হয় যা সার্বিক সাস্থের জন্য মারত্নক ক্ষতিকর।

০৫. ধূমপান পরিহার করা

ধুমপান ছেড়ে দেয়া সার্বিক সাস্থের জন্য খুবই উপকারী। ধূমপানের করণে হঠাত করেই আপনার রক্তচাপ বেডে যেতে পারে এবং এটি সাময়িকভাবে আপনার হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে ধূমপানের অভ্যাসের কারনে তামাকে থাকা রাসায়নিক আপনার রক্তনালীর দেয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আপনার রক্তচাপকে বাড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি এটি আপনার রক্তনালিকে সরু করে ফেলবে।

০৬. অতিরিক্ত চাপ নেয়া যাবে না

দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আমাদের অনেক ধরনের চাপের মধ্যদিয়ে যেতে হয়, বাসা, অফিস, দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদি নানা করণে আমাদের শারিরিক ও মানসিক চাপ বেড়ে যায় যা আমাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুকিতে ফেলে দেয়। চেষ্টা করতে হবে চাপ মুক্ত ভাবে থাকার জন্য। অতিরিক্ত চাপ থেকে মুক্তি পেতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে যেমন – ডিপ ব্রিরিদিং এক্সারসাইজ করা, কোথাও ঘুরে আসা, বই পড়া, গান শোনা বা পছন্দের কোন টিভি অনুষ্ঠান দেখা।

০৭. ইয়োগা বা মেডিটেশন করা

ইয়োগা বা মেডিটেশনের অনেক ধরনের সুফল রয়েছে – গবেষণায় দেখা গেছে যে ইয়োগা মানুষের ক্লান্তি বা চাপ কমাতে অনেকংশেই সাহায্য করে যা উচ্চ রক্তাচাপের ঝুকি কমায়।

০৮. পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম নিশ্চিত করা

ঘুমালে  রক্তচাপ সাধারণত হ্রাস পায় ।  যদি ভাল ঘুম না হয় তবে এটি আপনার রক্তচাপকে প্রভাবিত করতে পারে। যে সমস্ত ব্যক্তিরা পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না, বিশেষত যারা মধ্যবয়স্ক, তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশি থাকে।

০৯. রসুন খান বা খাবারে রসুনের ব্যবহার বাড়িয়ে দিন

উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী একটি জিনিস হলো রসুন৷ সকালে খালি পেটে এক কোয়া রসুন চিবিয়ে পানি খেলে রক্তচাপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকবে৷

১০.  উচ্চমাত্রায় প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া

২০১৪ সালে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যারা বেশি পরিমাণে প্রোটিন খেয়েছেন তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কম থাকে। যারা প্রতিদিন গড়ে ১০০ গ্রাম প্রোটিন খায় তারা উচ্চ রক্তচাপের ৪০% কম ঝুকিতে থাকেন। যারা তাদের খাবারে নিয়মিত ফাইবার যুক্ত করেছেন তারাও  উচ্চ রক্তচাপের ৬০% কম ঝুকিতে থাকবেন।

১১. ক্যাফইন বর্জন

ক্যাফেইন আপনার রক্তচাপের মাত্রা বাড়তে পারে।  রক্তচাপের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাফেইন জাতীয় খাবার খাওয়া সীমিত করুন।

১২. ঔষধ সেবন

যদি আপনার রক্ত চাপ অতিরিক্ত মাত্রায় বেশি হয়ে থাকে এবং উপরের দেয়া ধাপগুলো অনুসরন করেও আপনার ব্লাড প্রেশার কমছে না, সে ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে এবং ডাক্তারে পরামর্শ মতে প্রেশার কমানোর ঔষধ সেবন করতে হবে।

১৩. বোনাস টিপস

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখার জন্য উপরের পরামর্শগুলো মেনে চলার পাশাপাশি আপনাকে নিয়মিত আপনার রক্ত চাপ বা ব্লাড প্রেশার চেক করতে হবে। প্রেশার মাপার জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্লাড প্রেশার মেশিন বাজারে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে সকল প্রেশার মাপার মেশিনকে প্রধানত তাদের ধরন অনুযায়ী ২ টি ভাগে ভাগ করা যায়।

  1. এনালগ বা ম্যানুয়াল ব্লাড প্রেশার মেশিন (Manual Blood Pressure Monitor Machine)
  2. ডিজিটাল ব্লাড প্রেশার মেশিন (Digital Blood Pressure Monitor Machine)

এনালগ মেশিনে মূলত Aneroid Sphygmomanometer এবং stethoscope এর মাধ্যমে ব্লাড প্রেশার মাপা হয় এবং ডিজিটাল মেশিনে ব্লাড প্রেশার সেন্সর এর মাধ্যমে প্রেশার মাপা হয়। ব্লাড প্রেশার মেশিনের মান অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ব্রান্ড এর মেশিন এর দাম ভিন্ন ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। ব্রান্ড ও মান ভেদে একটি এনালগ ব্লাড প্রেশার মাপার মেশিনের দাম ১৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে মোটামুটি ভাল মানের একটি ব্লাড প্রেশার আপনি ২৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে পাবেন।

এদের মধ্যে কয়েকটি জনপ্রিয় ব্রান্ড এর নাম নিচে দেয়া হলো:

এনালগ ও ডিজিটাল যে কোন ধরনের ব্লাড প্রেশার এর দাম জানতে ছবিতে  বা এখানে ক্লিক করুনঃ

ALPK2 Blood Pressure Machine YAMASU Manual Blood Pressure Machine Digital blood pressure machine MDF Blood Pressure Machine

আরো পড়ুন

কি খেলে বাচ্চার ওজন বাড়ে – নবজাতক থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *