কি খেলে বাচ্চার ওজন বাড়ে – নবজাতক থেকে ২ বছর বয়স পর্যন্ত

কি খেলে বাচ্চার ওজন বাড়ে

কি খেলে বাচ্চার ওজন বাড়ে এ বিষয়টি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারনা থাকা প্রত্যেকটি নবজাতকের বাবা-মার জন্য অত্যান্ত গুরত্বপূর্ন একটি বিষয়। ইউনিসেফ এর তথ্য মতে বাংলাদেশে প্রায় প্রতি ৬ টি শিশুর ১ শিশু অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগে এতে করে উক্ত শিশুটির শারিরীক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্থ হয়। আপনার ছোট শিশুর প্রাথমিক অপুষ্টি আজীবন তার সাস্থের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই আর্টিকেলটি থেকে আপনি আপনার বাচ্চার ওজন বৃদ্ধ্বির ব্যপারে আপনাকে আরো সচেতন হতে সাহায্য করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

বাচ্চাকে দিনে কতবার খাওয়াতে হবে

শিশুরা জানে সে কখন ক্ষুধার্ত বা পরিপূর্ণ । আপনার শিশু প্রতিবার ক্ষুধার্ত অবস্থায় তাকে খাওয়ান। বুকের দুধ খাওয়ানো শিশুদের দিনে ৮ থেকে ১২ বার বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত, প্রতিবার স্তন দানের সময় প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট হওয়া উচিত। ফর্মুলা বা প্যাকেটজাত দুধ খাওয়ানো শিশুদের রাতের খাবার সহ দিনে ছয় থেকে দশবার খাওয়ানো উচিত।

১-২ বছরের বাচ্চাদের দিনে ৪ থেকে ৬ বার খাবার দেয়া উচিত এবং প্রতি ৪ বার খাবারের মাঝখানে ২ বার হালকা খাবার দেয়া যেতে পারে। ১ বছরের বাচ্চাদের জন্য শক্ত খাবার এবং স্বাস্থ্যকর হালকা খাবারই শক্তি এবং পুষ্টির প্রধান উৎস।

বাচ্চার বয়স ৬ মাস পর্যন্ত

বুকের দুধ অথবা প্যাকেটজাত দুধ

বুকের দুধ খায় এমন নবজাতক বা শিশুদের ওজন বৃদ্বির জন্য প্রতি ১-২ ঘন্টা পর পর খাওয়াতে হবে এবং বাচ্চার ৪ মাস বয়স পর্যন্ত প্রতিদিন প্রায় ৮-১২ বার করে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। আপনার শিশুকে এমনভাবে খাওয়াবেন যাতে আপনার স্তন পুরোপুরি খালি হয়ে যায়। এটি বলার কারণ হচ্ছে দুধ খাওয়ানর সময় জমা থাকা আগের দুধ থেকে সর্বশেষ বেরিয়ে আসা দুধের পুষ্টিগুন অনেক বেশি হয়ে থাকে। আপনি বুকের দুধের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য এমন কিছু খাবার আপনার খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন যা খেলে বুকের দুধ বাড়ে।

মনে রাখতে হবে যে শিশুর সঠিক বিকাশ ঘটাতে দুধের বিকল্প নেই। তাই শিশুর প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় দুধ অবশ্যই থাকতে হবে। ১-৬ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধই শিশুর জন্য যথেষ্ট । এছাড়া যদি বুকের দুধের অপর্যাপ্ততা বা কোন শারীরিক সমস্যার কারণে শুধুমাত্র বুকের দুধ থেকে আপনার শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি না পায় সে ক্ষেত্রে আপনি বাচ্চাদের জন্য নির্ধারিত প্যাকেটজাত দুধ আপনার শিশুকে দিতে পারেন।

আপনার শিশুকে কোন ধরনের প্যাকেটজাত দুধ খাওয়াবেন তা নিশ্চিত হবার জন্য একজন শিশু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার শিশুর ১২ মাস বয়স না হওয়া পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে (এবং যতক্ষণ না শিশু এবং মা চালিয়ে যেতে চান)। আপনার বাচ্চাকে কমপক্ষে ১২ মাস না হওয়া পর্যন্ত গরুর দুধ দেবেন না কারণ এটি আপনার শিশুর জন্য সঠিক ধরণের পুষ্টি সরবরাহ করে না।

বাচ্চার বয়স ৬ – ৯ মাস পর্যন্ত

ডিম বা ডিমের সাদা অংশ

ডিম হলো আরেকটি সুপার ফুড যা শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সমানভাবে কার্যকরী। এটি চর্বি এবং প্রোটিনের একটি গুরত্বপূর্ন উৎস এবং এটি খেলে বাচ্চার ওজন বাড়ে এটা প্রমাণিত। প্রতি ১০০ গ্রাম ডিমে প্রায় ১৪ গ্রাম প্রোটিন রয়েছে। আর শিশুর ওজন বৃদ্ধিতে প্রোটিনের ভুমিকা অপরিসীম। তাই আপনার শিশুর প্রতিদিনের খাবারে ডিম রাখুন।

মিষ্টি আলু

ছয় মাস বয়সের পর থেকে যে কোন সুস্থ বাচ্চাকে মিষ্ট আলু দেয়া যেতে পারে। পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিনের সমৃদ্ধ এই খাবারটি দ্রুত শিশুর ওজন বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে।

১ থেক ২ বছর পর্যন্ত

শক্ত খাবার দেয়ার আগে সতর্কতা

  • আপনার বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য একটি শিশুর চামচ এবং বাটি ব্যবহার করুন।
  • আপনার বাচ্চার ১ বছর বয়স হবার আগ পর্যন্ত তাকে মধু খাওয়ানোর থেকে বিরত রাখুন। মধুতে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া (ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম) রয়েছে যা খুব বিপজ্জনক এবং শিশুদের পক্ষাঘাত সৃষ্টি করতে পারে।
  • খাবার চামতে একবারে অল্প পরিমাণে শিশুর খাবার নিন।
  • শিশুর খাবার সামান্য গরম করতে পারেন অথবা আপনি এটি ঘরের তাপমাত্রায় রেখে খাওয়াতে পারেন।
  • সর্ব উৎকৃষ্ট উপায় হলো শিশুর খাবার যদি আপনি নিজেই তৈরি করতে পারেন।
  • ডক্তারের পরামর্ষ পরামর্শ ছাড়া অথবা খুব বেশি আসুবিধা না হলে বাজারের প্রচলিত প্যাকেটজাত খাবার আপনার শিশুকে দেয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • মাইক্রোওয়েভ দিয়ে খাবার বানানো বা গরম করার ব্যপারে সাবধানতা অবলম্বন করুন কারণ এটি খাবারকে অসমভাবে গরম করতে পারে এবং খাবারের প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুন নষ্ট করে দিতে পারে।
  • আপনার শিশুর খাবারে অতিরিক্ত লবণ বা চিনি যোগ করার প্রয়োজন নেই। এটি সব সময় নিরুৎসাহিত করা হয়।

আপনার শিশু যখন শক্ত খাবার খেতে শুরু করবে, সে কম পান করবে। আস্তে আস্তে আপনার দেওয়া কঠিন খাবারের পরিমাণ বাড়ান এবং বুকের দুধ বা প্যাকেটজাত দুধের পরিমাণ হ্রাস করুন। মনে রাখবেন ১ থেকে ২ বছর বয়সি বকচ্চাদের খাবার সবসময় চামচ দিয়ে দেওয়া উচিত বোতলে নয়।

কি খেলে বাচ্চার ওজন বাড়ে

অ্যাভোকাডো

আপনার বাচ্চার ওজন বৃদ্বির জন্য অ্যাভোকাডো একটি দুর্দান্ত খাবার, এতে ফ্যাট, ক্যালোরি এই দুইটি উপাদানই একসাথে থাকে। তাই চেষ্টা করুন যাতে আপনার শিশু নিয়মিত এই খাবারটি খায়। যদিও এই ফলটি স্বাদ বাচ্চাদের কাছে অতটা পছন্দের হবে না তবুও এর পুষ্টিগুন বিবেচনার আপনার বাচ্চাকে এর সাথে অভ্যস্থ করে তুলুন।

মাখন

মাখন স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের অন্যতম উৎস। বড়দের মাখন খাওয়ায় কিছুটা সাবধান থাকতে হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ওজন বৃদ্ধির জন্য শিশুর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাখন রাখুন। তা হতে পারে মাখন রুটি বা অন্যকিছু। এটি দ্রুত শিশুর ওজন বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।

কলা

ছয় মাস বয়সের পর থেকে শিশুকে কলা দেওয়া যেতে পারে। কলায় প্রচুর পরিমাণ ফাইবার, পটাশিয়াম, ভিটামিন সি, ভিটামিন বি ৬ রয়েছে যা শিশুর শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করে ওজন বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

মুগ ডাল ও মসুরের ডাল

মুগ ডাল এবং মসুরের ডাল বাচ্চাদের ওজন বাড়াতে অনেক সাহায্য করে। মসুরের ডালপুষ্টির একটি পাওয়ার হাউস, এতে থাকা উচ্চ ক্যালসিয়াম এবং প্রোটিন এবং অপরিহার্য ফ্যাটি অ্যাসিড যা মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে। তাই ডাল শিশুদের জন্য খুবই স্বাস্থ্যকর একটি খাবার।

গাজরের মিল্কশেক

বাচ্চাদের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর মিল্কশেক, গ্রীষ্মকালীন বিশেষ পানীয় তাপকে মোকাবেলা করার জন্য। গাজর একটি চমৎকার সুপার ফুড, এটি শরীরকে পুষ্টি দেয় এবং চাঙ্গা করে। এগুলি সেবনের উপকারিতা অপরিসীম কারণ এগুলিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ এবং অন্যান্য অনেক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। কাঁচা বা সেদ্ধ করা গাজর, দুধ এবং বাদাম ব্যবহার করেও এই মিল্কশেক তৈরি করা যায়।

ব্লেন্ড করা মুরগির মাংস বা স্যুপ

প্রোটিনের অন্যতম একটি উৎস হলো মুরগির মাংস। এটি পেশি মজবুত করে শিশুর ওজন বৃদ্ধি করে। তবে প্রতিদিন খাদ্য তালিকায় মুরগির মাংস না রেখে মাছের পাশাপাশি সপ্তাহে এক দুই দিন মুরগির মাংস রাখুন।

chicken soup for baby

মাছ

মাছ প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি সরবরাহ করে যা আপনার ছোটদের বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যক। কম চর্বিযুক্ত বড় মাছের ছোট ছোট টুকরো আপনার বাচ্চার খাদ্য তালিকাকে করবে সমৃদ্ধ। পাশাপাশি, এই এবং অন্যান্য মাছগুলিতে মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য পুষ্টিকর ডোকোসাহেক্সেনোইক অ্যাসিড (ডিএইচএ) রয়েছে, এক ধরণের ওমেগা-3 ফ্যাটি অ্যাসিড যা শৈশবে সঠিক মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য অপরিহার্য ।

আপনার সন্তানের ওজন নিয়ে আপনার কি উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?

যদি আপনার শিশুর শরীরে খেলাধুলা করার মত পর্যাপ্ত শক্তি থাকে এবং সময়ের সাথে সাথে তার শারীরিক পরিবর্তনগুলো লক্ষনীয় করা হয়, তাহলে সম্ভবত সে ঠিকঠাক বেড়ে উঠছে।

যতক্ষণ না একজন ডাক্তার আপনার শিশুর ওজন নিয়ে কোনো সমস্যা চিহ্নিত করছেন, ততক্ষণ আপনাকে এ বিষয়ে চিন্তা করার দরকার নেই।

যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলতে হবে

জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয়, চিপস, চকলেট এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করা এড়িয়ে চলুন। দোকানে তৈরি তেলে ভাজা খাবার যেমন বিস্কিট, কুকিজ, কেক, সোডা এবং ক্যান্ডি বাচ্চাদের সাথের জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। এতে প্রচুর পরিমাণে চিনি, লবণ, চর্বি এবং রাসায়নিক রয়েছে যা আপনার সন্তানের পেট ভরাট করে ফেলে যা পুষ্টিকর খাবারে ভরা উচিত ছিল।

foods to avoid

ওজনের বৃদ্ধির সাথে উচ্চতা

বাচ্চার ওজন বৃদ্ধির পাশাপাশি তার উচ্চতাও যে সঠিক ভাবে বাড়ছে সে বিষয়ে অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা ও জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর এর নীতিমালা অনুসরণ করা যেতে পারে।

বাসায় শিশুর ওজন ও উচ্চতা মাপতে বেবি ওয়েটিং স্কেল এর ব্যবহার আপনার দুশ্চিন্তা অনেকাংশেই কমিয়ে দিতে পারে। নিচে একটি ভাল মানের বাচ্চাদের ওজন মাপার স্কেল এর ছবি দেয়া হলো।

Beurer Digital Baby & Pet Scale, BY80

এছাড়া বাংলাদেশের সেরা ৫ টি বেবি ওয়েটিং স্কেল দেখতে এখানে ক্লিক করুন।

শিশুর ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধির চার্ট

নিচে বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা কতৃক প্রদত্ত ওজন বৃদ্ধির চার্ট দেয়া হলো।

শিশুর ওজন ও উচ্চতা বৃদ্ধির চার্ট

বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা কতৃক প্রদত্ত ওজন বৃদ্ধির চার্ট

নিচে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর কতৃক প্রদত্ত ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ওজন ও উচ্বৃচতা বৃদ্ধির চার্ট এর ডাউনলোড লিঙ্ক দেয়া হলো।

সবশেষে

আপনার ছোট শিশুর প্রাথমিক পুষ্টি আজীবন তার সাস্থে প্রভাব ফেলতে পারে। একটি শিশু যথেষ্ট পরিমাণে খাচ্ছে কিনা এবং যথেষ্ট বৃদ্ধি পাচ্ছে কিনা বর্তমানে এ বিষয়টি অনেক বাবা -মায়ের জন্য উদ্বেগের বিষয়।

যদি দেখেন আপনার বাচ্চা হটাথ করে খেলছে না বা স্বাভাবিক ভাবে সে যতটুকু খাদ্য গ্রহন করতো এখন তা করছে না, তাহলে কোনো হেলথকেয়ার প্রফেশনাল এর সাথে কথা বলুন এবং চিনহিত করুন কেন তার মধ্যে এমন পরিবর্তন লক্ষনীয়।

আরো পড়ুন

সুত্রঃ C.S. Mott Children’s Hospital এবং Healthline.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *